শিশুদের হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট তুলে দেওয়া এখনকার সময়ে সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে স্ক্রিন টাইম বা ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার শিশুদের মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদী কোনো ক্ষতি করছে কি না, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে চলছে তীব্র বিতর্ক।
একদিকে স্ক্রিন টাইমকে মানসিক অবসাদ ও আচরণগত সমস্যার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে অনেক বিজ্ঞানী বলছেন এর ক্ষতিকর দিক নিয়ে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ নেই।
স্নায়ুবিজ্ঞানী ব্যারোনেস সুসান গ্রিনফিল্ডের মতে, ইন্টারনেটের ব্যবহার এবং কম্পিউটার গেম কিশোরদের মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে। তিনি একে এক ভয়াবহ পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে এই দাবির সঙ্গে একমত নন বাথ স্পা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক পিট এটচেলস।
তার মতে, স্ক্রিন টাইমের ভয়াবহ ফলাফল নিয়ে যেসব দাবি করা হয়, তার সপক্ষে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাব রয়েছে। ২০২১ সালের আমেরিকান সাইকোলজি অ্যাসোসিয়েশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় খুব সামান্যই ভূমিকা রাখে।
অধ্যাপক অ্যান্ড্রু প্রিজবিলস্কি সাড়ে ১১ হাজার শিশুর মস্তিষ্কের স্ক্যান ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, দিনে কয়েক ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার করলেও তা বুদ্ধিবৃত্তিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির স্পষ্ট কারণ হয় না।
তবে গবেষকরা স্বীকার করেছেন যে, অনলাইনের কিছু গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে, যেমন—প্রতারণা, যৌন হয়রানি বা ক্ষতিকর কনটেন্ট সহজে দেখার সুযোগ।
ভিন্ন মত পোষণ করেন সান ডিয়েগো স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জিন টোয়েনজি। তিনি মনে করেন, ১৬ বছর বয়সের আগে মস্তিষ্ক পুরোপুরি বিকশিত হয় না, তাই শিশুদের স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখাই যৌক্তিক।
তার মতে, অনলাইনে বেশি সময় কাটানো মানেই হলো একা সময় কাটানো, যা ঘুম কমিয়ে দেয় এবং সরাসরি সামাজিক মেলামেশার সুযোগ কমিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
ডেনমার্কের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্ক্রিন টাইম কমানো শিশুদের আচরণের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং তাদের সহানুভূতিশীল করে তুলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো স্ক্রিন টাইম না রাখা এবং চার বছরের নিচের শিশুদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্ক্রিন টাইম বিষয়টি বেশ ধোঁয়াটে; এটি আনন্দদায়ক বা তথ্যমূলক কি না, তার ওপর প্রভাব নির্ভর করে। প্রযুক্তি যেহেতু আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে, তাই এর ব্যবহারের ধরন এবং শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।